ভূমিকা

সম্পাদনা

মৌল কী? এই প্রশ্নটির উত্তর জানতে হলে, আমাদের জানতে হবে রসায়ন সম্পর্কে। তাহলে প্রশ্ন জাগে, "রসায়ন কী"? কোন বস্তু এবং এই বস্তুটির মধ্যে যে সব পরিবর্তন হয় সে সব বিষয়ে নিয়ে যে পড়ালেখা তাই হল রসায়ন। দূর্ভাগ্যজনকভাবে, এতটুকু বললে রসায়ন সম্পর্কে বেশি কিছু বোঝা যায় না। আসলে এতটুকু বললে রসায়ন সম্বন্ধে বেশি কিছু বলাও হয় না। রসায়ন আরও বড় একটা ব্যাপার; যার সম্পর্কে আমরা পরবর্তীতে আরও জানব।

এই পৃথিবীতে, সৌরজগতে, ছায়াপথে, মহাবিশ্বে যা কিছু আছে তার সবই বস্তু দিয়ে গঠিত। আমরা যা কিছু ছুঁতে পারি, বা দেখতে পারি, বা অনুভব করতে পারি, বা ঘ্রাণ নিতে পারি তার সবকিছুকেই বিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন বস্তু। বস্তু জায়গা দখল করে এবং বস্তুর ওজন আছে। নির্ভুলভাবে বলতে গেলে, আমাদের বলা উচিৎ বস্তুর আয়তন এবং ভর আছে। অন্য কথায়, বস্তুতে অনেকগুলো উপাদান আছে, আর মৌলগুলোই(এখনপর্যন্ত ১১৮টি) বস্তুর উপাদানগুলো তৈরী করে থাকে।

আমরা আমাদের চারপাশে যে সব বস্তু দেখি তার বেশির ভাগই একের বেশি মৌল দিয়ে তৈরী। অবশ্য এমন কিছু বস্তু আছে, যাদের আমরা দেখতে পারি এবং ধরতে পারি, তারা শুধু একটা মাত্র মৌল দিয়ে তৈরী। যেমন, হীরা বা ডায়মন্ড শুধু একটি মৌল দিয়ে তৈরী, আর এই মৌলটির নাম হল "কার্বন"। আশ্চর্যজনকভাবে, আমরা আঁকার বা লেখার কাজে যে পেন্সিলের শীষ(গ্রাফাইট) ব্যবহার করি, তাও কার্বন দিয়ে তৈরী। শুধু পার্থক্য হল, হীরাতে কার্বন সাজানো থাকে একভাবে আর গ্রাফাইটে ভিন্নভাবে।

আমরা আরও কিছু বস্তু দেখি যেগুলো একটি মাত্র মৌল দিয়ে তৈরী, যেমন কোক বা স্প্রাইটের ক্যান বোতলগুলি শুধু এলুমিনিয়াম দিয়ে তৈরি; স্বর্ণের তৈরী গহনা; যে সব বেলুন উপরের দিকে উড়ে যায় সেগুলোর ভেতর যে হিলিয়াম গ্যাস থাকে; ঘরের ছাদ তৈরিতে যে সীসার পাত ব্যবহার করা হয় ইত্যাদি।

সত্যিকার অর্থে এই উদাহরণগুলো মৌলের পুরোপুরি নিখুঁত উদাহরণ নয়; কারন প্রায় সবসময়ই এই মৌলগুলোর মধ্যে কিছু না কিছু ভেজাল মিশে থাকে।

অধিকাংশ মৌলই একটি আরেকটির সাথে শক্তিশালী "রাসায়নিক বন্ধন" দিয়ে শক্তভাবে আঁটকে থাকে, তাই মৌলগুলোকে বিশুদ্ধ করতে একটা আরেকটা থেকে আলাদা করতে হয়। কিছু কিছু মৌল শুধু তাপ অথবা বিদ্যুত দিয়েই সহজে আলাদা করা যায়।

প্রাচীন মানুষেরা লোহা মৌলটিকে বিশুদ্ধ করার নিয়ম জানত। তারা মাটি খুঁড়ে পাওয়া লোহার আকরিকগুলো কে কাঠ পুড়িয়ে যে কাঠকয়লা পাওয়া যায় তার সাথে তাপ দিয়ে(গরম করে) লোহা বিশুদ্ধ করত। যে বস্তুটির মধ্যে লোহা ছিল, তা আসলে দুটি মৌল লোহা আর অক্সিজেন দিয়ে তৈরি একটা "যৌগ"। এই যৌগটিতে কাঠকয়লার সাথে তাপ দিয়ে অক্সিজেন কে কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাস হিসেবে আলাদা করে নেওয়া হত, আর লোহা অবশিষ্ট থাকত।

সাধারণ খাবার লবণকে খুব বেশি তাপমাত্রায় গলিয়ে এর মধ্যে দিয়ে বিদ্যুত প্রবাহ করলে সোডিয়াম আর ক্লোরিন মৌল দুটি আলাদা হয়ে যায়। আর লবণটিকে বলা হয় সোডিয়াম আর ক্লোরিন এর "যৌগ"। এর বৈজ্ঞানিক নাম হল সোডিয়াম ক্লোরাইড।

যে সব গ্যাস এক একটা মৌল, তাদেরকে বলা হয় মৌলিক গ্যাস। আমাদের চারপাশে যে বায়ু আছে তা বিভিন্ন মৌলের একটা অন্যতম উৎস। বায়ুতে মৌলিক গ্যাসগুলো মিশ্রিত অবস্থায় থাকে। এছাড়া আরও কিছু গ্যাস আছে যেগুলো আসলে মৌল নয়, বরং যৌগ।

বায়ু থেকে মৌলিক গ্যাসগুলো আলাদা করতে হলে এই বায়ুকে খুব ঠাণ্ডা করতে হয়; এমনকি সাইবেরিয়ার শীতকালের তাপমাত্রা থেকেও বেশি ঠাণ্ডা! প্রায় -১৯০ তাপমাত্রায় এটি তরলে পরিণত হবে। আমরা জলীয় বাষ্প ঠাণ্ডা করে যেমন পানি পাই ব্যাপারটা ঠিক তেমনি। তারপর এই তরল ফুটানো হলে এর থেকে একটা একটা করে মৌলিক গ্যাস বের হতে থাকে। অক্সিজেন, নাইট্রোজেন এই মৌলিক গ্যাসগুলোর সাথে সাথে কিছু "আদর্শ গ্যাস" মৌলও পাওয়া যায় যেমন, আর্গন, জেনন আর ক্রিপ্টন। আরও দুটি আদর্শ গ্যাস আছে; এরা হলঃ হিলিয়াম আর নিয়ন। বায়ুকে আরও বেশি ঠাণ্ডা করে এদেরকে আলাদা করা হয়।

রসায়নের খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিছু জিনিষ যেমনঃ অণু, পরমাণু, ইলেকট্রন, নিউক্লিয়াস ইত্যাদির নাম হয়ত তুমি শুনেছ। তুমি নিশ্চয়ই অবাক হচ্ছ, এই বিষয়গুলির কোনটিরই নাম উচ্চারণ না করেই মৌল নিয়ে এতগুলো আলোচনা হয়ে গেছে! আসলে এখন থেকে মাত্র ১৫০ বছর আগেও রসায়নবিদরা এই বিষয়গুলো নিয়ে খুব বেশি কিছু জানতেন না; যদিও তাঁরা মৌল আর যৌগের পার্থক্যের ব্যাপারে বুঝতে পেরেছিলেন।

বর্তমানে আমরা বিশেষ অণুবীক্ষণযন্ত্র ব্যবহার করে পরমাণু দেখতে পারি। বিশেষ অণুবীক্ষণযন্ত্র একটা ক্ষুদ্র জিনিসকে সাধারণ অণুবীক্ষণযন্ত্রের তুলনায় লক্ষগুণ বড় করে দেখাতে পারে। স্ক্যানিং ইলেকট্রন অণুবীক্ষণযন্ত্রের নিচে পরমাণু রাখলে আমরা এর ত্রিমাত্রিক(থ্রি-ডি) ছবি দেখতে পাই, যা দেখতে একটা ঝাপসা বলের মত মনে হয়।

কেন বিভিন্ন ধরনের মৌল পাওয়া যায় আর কেনই বা মৌলগুলো ভিন্ন ভিন্ন যৌগ গঠন করে? এই বিষয়গুলো পরমাণু এর ধারণা থেকে ব্যাখ্যা করা যায়।

পরমাণু মৌলগুলোর পর্যায় সারণি সম্পর্কেও ব্যাখ্যা করে, যদিও পর্যায় সারণির অধিকাংশই ডোবেরিনার আর মেন্ডেলিভের মত অনেক আগের রসায়নবিদরা তৈরী করে গেছেন(চতুর্থ অধ্যায় দেখ)। কেন মাত্র ৮১টি মৌলের পরমাণুই আজীবন টিকে থাকবে তার ব্যাখ্যাও পরমাণুর ধারনা থেকে জানা যায়।